আজ বাউন্সের আঘাতে ফিলিপ হিউজের মৃত্যুর ৫ বছর

তিন দিন পরেই নিজের ২৬তম জন্মদিনের কেকটি কাটতেন ফিলিপ হিউজ। ৩০ নভেম্বর ছিল তার জন্মদিন। অনাকাঙ্খিত এক ঘটনায় ২৭ নভেম্বর না ফেরার দেশে চলে যেতে হয় অস্ট্রেলিয়ার টপঅর্ডার এই ব্যাটসম্যানকে। ২০১৪ সালের ২৭ নভেম্বর মারা যান হিউজ।

তার মৃত্যু ক্রিকেট ইতিহাসের একটা বড় অংশ হয়ে থাকে। বলের আঘাতে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে হেরে যাওয়া ফিল হিউজ কাঁদিয়েছেন বিশ্ব ক্রিকেটকে। নিউ সাউথ ওয়েলসে জন্ম নেওয়া এই অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার সিডনির সেন্ট ভিনসেন্ট হাসপাতালে দুই দিন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে না ফেরার দেশে চলে যান।

১৯৮৮ সালের ৩০ নভেম্বর, বাবা গ্রেগরি এবং মাতা ভার্জিনিয়ার ঘরে নিউ সাউথ ওয়েলসের উত্তর উপকূলের একটি ছোট্র শহর ম্যাকসভিলে জন্মগ্রহণ করেন হিউজ। বাবা ছিলেন কলা চাষী আর ইতালিয়ান মা ঘরেই থাকতেন। আর তিনটি দিন বেঁচে থাকলে হয়তো নিজের ২৬তম জন্মদিন পালন করতে পারতেন।

কিন্তু সাড়ে পাঁচ আউন্সের ক্রিকেট বলটি তা আর হতে দেয়নি। সিডনিতে ম্যাচ চলাকালে মাত্র পাঁচ আউন্স ওজনের বলটি হিউজের হেলমেটের নিচে মাথায় লাগে, মাঠ থেকে সরাসরি হাসপাতালে। তার অকাল মৃত্যু আজও ক্রিকেট প্রেমীদের মনে সৃষ্টি করে রেখেছে অসীম শূন্যতা। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ২০১৪ সালের ২৫ নভেম্বরে ঘরোয়া ক্রিকেট প্রতিযোগিতা শেফিল্ড শিল্ড ম্যাচে সাউথ অস্ট্রেলিয়া এবং নিউ সাউথ ওয়েলস এর মধ্যকার ম্যাচে ব্যাট করছিলেন সাউথ অস্ট্রেলিয়ার টপঅর্ডার ব্যাটসম্যান হিউজ।

৬৩ রানে তখন অপরাজিত হিউজ, বোলিং মার্কে নিউ সাউথ ওয়েলসের পেসার শিন অ্যাবোট। তার একটি বাউন্স বলে পুল করতে গিয়েছিলেন হিউজ। টাইমিং না মেলায় বল গিয়ে লাগে হিউজের হেলমেটের নিচ দিয়ে কানের ঠিক নিচে, কাঁধের একপাশে। শেষ মুহূর্তে বলের উপর থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে এক করুণ সমাপ্তির চির-বেদনার গল্প হয়ে যান হিউজ। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে জ্ঞান হারান, যে জ্ঞান আর কখনোই ফিরে আসেনি। মাটিতে পড়ে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসায় অবস্থার পরিবর্তন না হলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঘটনার পর পরই ম্যাচটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

হাসপাতালের বিছানায় কোমায় থেকেই তার মৃত্যু হয়। মেডিকেলের ভাষায় জানানো হয়, বলটি হিউজের মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ করা ধমনীতে আঘাত করলে সেই ধমনী ছিন্ন হয়ে যায় (vertebral artery dissection)। এরফলে রক্ত জমাট বেঁধে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে ব্রেইন হ্যামারেজে মৃত্যু হয় তার।

হিউজের এই চলে যাওয়া আর জীবন-মুত্যুর মাঝের দুদিন বিশ্বক্রিকেটে ফ্যানদের এক সূঁতোয় গেথে দিয়েছিল, সোশ্যাল মিডিয়া আর আধুনিক প্রযুক্তি সবাইকে এক বিন্দুতে মিলিয়েছিল। এমন হৃদয় বিদারক ঘটনা ক্রিকেটে আর যে ঘটেনি।

অ্যারন ফিঞ্চ, ম্যাথু ওয়েড, ডেভিড ওয়ার্নার, স্টিভ স্মিথ, শেন ওয়াটসন, ব্রাড হাডিন, নাথান লায়ন, মরিস হেনরিকস, মিচেল স্টার্ক, ড্যানিয়েল স্মিথ থেকে শুরু করে সাইমন ক্যাটিচ, ব্রেট লি, ফিল জ্যাকস, পিটার ফরেস্ট, জর্জ বেইলি, জাস্টিন ল্যাঙ্গার, তখনকার অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের প্রধান নির্বাহী জেমস সাদারল্যান্ড, কোচ ড্যারেন লেহম্যান, ম্যানেজার প্যাট হাওয়ার্ড সবাই হাসপাতালে হিউজের পাশে ছিলেন। মেলবোর্ন থেকে ছুটে এসেছিলেন রিকি পন্টিং ও পিটার সিডল।

নিজ ঘরের বিপক্ষে খেলছেন বলেই হয়তো ক্রিকেটের স্বাভাবিক স্লেজিংটা নিয়মিতই হচ্ছিলো। প্রতিপক্ষের এক বোলার মজা করেই বলেছিলেন, “I will Kill You”! সেদিন মোট ২০টি বাউন্সার দেয়া হয়েছিল বাউন্সে কিছুটা দুর্বল হিউজকে। তবে, ১৯টি বাউন্স সাবলীলভাবেই রুখে দিয়েছিলেন হিউজ। কিন্তু ২০তম বাউন্সারটাই যে ক্যারিয়ারের শেষ বাউন্সার সেটা মাঠে উপস্থিত কেউই হয়তো কল্পনাতেও আনেননি। হিউজের মৃত্যুতে ভেঙে পড়ে গোটা ক্রিকেট বিশ্ব। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে সে সময় অনুষ্ঠিত পাকিস্তান বনাম নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার তৃতীয় টেস্টের দ্বিতীয় দিনের খেলা স্থগিত করা হয়। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশ ও ভারতীয় দলের অনুশীলন ম্যাচটিও বাতিল করা হয়।

বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ের মধ্যকার চতুর্থ ওয়ানডে শুরুর আগে ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হয়েছিল এবং সকল খেলোয়াড় কালো ব্যাজ ধারণ করেছিলেন।

মাত্র ২০ বছর বয়সে ২০০৯ সালে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হওয়ার আগে নিউ সাউথ ওয়েলসের বিপক্ষে দুই মৌসুমের জন্য খেলেছিলেন বাঁহাতি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিউজ। শর্ট বল খেলার দুর্বলতার কারণে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ২০০৯ সালের অ্যাশেজ সিরিজ চলাকালীন সময়ে টেস্ট স্কোয়াড থেকে বাদ পড়ে যান। তার জায়গায় দলে আসেন শেন ওয়াটসন। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে এবং ২০১০ সালের মার্চে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করা হয় হিউজকে।

হিউজকে দেখা হতো অস্ট্রেলিয়ার ‘দ্বিতীয় গিলক্রিস্ট’, অজি এই কিংবদন্তি উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যানের মতো না হলেও দলের প্রয়োজনে উইকেটের পেছনে দাঁড়াতেন হিউজ। অপার সম্ভাবনা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট অঙ্গনে আসলেও সম্ভাবনার রঙিন মলাটে জড়ানো ক্যারিয়ারটা শেষ হয়েছিল সবাইকে কাঁদিয়ে। ব্যাগি গ্রীন নাম্বার ৪০৮, অপরাজিত ৬৩ এই দুটি ছোটো বাক্যে বিশ্বজুড়ে ক্রিকেট প্রেমীদের যুগ যুগ কাঁদিয়ে যাবেন হিউজ। হিউজের মতো এমন বিদায় যে কারো কাম্য নয়। ফেরার লড়াইয়ে মাঠে নেমে মাঠ থেকেই না ফেরার দেশে।

হিউজ মাত্র ১২ বছর বয়সেই করেছিলেন ‘এ’ গ্রেড সেঞ্চুরি। ১৭ বছরে পাড়ি জমান সিডনিতে। গ্রেড ক্রিকেটের অভিষেক ম্যাচেই ১৪১* রানের ইনিংস খেলে বুঝিয়ে দেন অনেক বড় লক্ষ্য নিয়েই বড় মঞ্চে পা রেখেছেন। সেই মৌসুমে ৭৫২ রান করে জায়গা করে নেন ২০০৮ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে। নিউ সাউথ ওয়েলস দ্বিতীয় একাদশের হয়ে এক ম্যাচে ৫১ এবং ১৩৭ রানের দুটি ইনিংস খেলে সরাসরি জায়গা করে নেন রাজ্য দল নিউ সাউথ ওয়েলস মূল একাদশে। তাসমানিয়ার বিপক্ষে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় মাত্র ১৮ বছর ৩৫৫ দিন বয়সে। মাইকেল ক্লার্কের অভিষেকের (১৯৯৯ সালে) পর হিউজ ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ নিউ সাউথ ওয়েলস ক্রিকেটার। অভিষেক ম্যাচে ৫১ রান করেছিলেন তিনি। অভিষেক মৌসুমে করেছিলেন ৬২.১১ গড়ে ৫৫৯ রান, শেফিল্ড শিল্ড ফাইনালে সেবার করেছিলেন ১১৬ রান। তাতে শিল্ড ফাইনালের সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ানের রেকর্ড এখনো হিউজের দখলেই।