ভারতের বিপক্ষে সেই হারের পর তিন মাস ঘুমাতে পারেননি মুশফিক!

৩ বলে ২ রান, ২০১৬ সালের সেই টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। গোটা দেশ সহ টাইগার ড্রেসিংরুম জয়ের আগেই মেতে উঠেছিল জয়ের আনন্দে। কিন্তু সেটা শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি মুশফিক-মাহমুদউল্লাহদের ভুলে। এমন জয়ের কাছে গিয়ে হারার কষ্টটা একটু বেশিই ছিল মুশফিকের। সে কারনে না কি তিন মাস ঘুমাননি তিনি। এমনটাই ভারতীয় পত্রিকা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন মুশফিকের বাবা।

রবার্ট ব্রুসকে সাফল্যের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল সাতবার। আর মুশফিকুর রহিমকে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য দিন গুনতে হয়েছে প্রায় চার বছর। ২০১৬-র ২৩ মার্চের কথা স্মরণ করলে এখনও আঁতকে ওঠেন বাংলাদেশের উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান। ৩ বলে ২ রান! টি২০ বিশ্বকাপে ভারত-জয়ের আগাম সেলিব্রেশনে মেতেছিলেন। তবে অভিশপ্ত ম্যাচে মুশফিকুরের ব্যাটে ভর করে বাংলাদেশ জয়ের সীমান্ত পেরোতে পারেনি। রাতারাতি ট্র্যাজিক হিরোর তকমা সেঁটে গিয়েছিল জার্সিতে। আলোর গোলার্ধ থেকে অতলান্ত আধাঁর নেমে এসেছিল মুশফিকুরের ক্রিকেট সংসারে।

ক্রিকেট ঈশ্বর অবশ্য মুশফিকুরকে ফের একবার পুরনো ভুল সুদে আসলে মিটিয়ে ফেলার সুযোগ এনে দিয়েছিলেন রবিবার। খোদ রাজধানী শহরে। এবারে অবশ্য বাংলার কোটি কোটি ক্রিকেট বুভুক্ষু সমর্থকদের হতাশ করেননি। দায়িত্ব নিয়ে ক্রিজে টিকে ম্যাচ ফিনিশ করে এসেছেন। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ব্যাটিং করতে নেমে ৪৩ বলে ৬০ রান! পাশাপাশি ভারতের তরুণ বোলারদের শাসন। অধিনায়ক মাহমুদ্দুল্লা ছক্কা হাকিয়ে ফিনিশিং টাচ দিলেও নায়ক একজনই- মুশফিকুর। বেঙ্গালুরুতে যে কলঙ্কের সূচনা, তারই যেন সমাপ্তি দিল্লিতে এসে! ম্যাচের সেরাও তিনি। রূপকথা নয়তো কী!

কেমন ছিল দুঃস্বপ্নের সেই দিনগুলো? বগুড়া থেকে মুশফিকুরের বাবা মাহবুব হামিদ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলার প্রতিনিধিকে বললেন, “আমার ছেলের মাথা থেকে একটা ‘বোঝা’ নেমে গেল। বেঙ্গালুরুতে সেই ম্যাচ আমাদেরই জেতার কথা। ৩ বলে ২ রান, এমন পরিস্থিতিতে ম্যাচ কেউ হারে? কিন্তু মুশফিক সেদিন পারেনি। এই ওর ব্যক্তিগত জীবনে মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলেছিল। টানা তিন মাস ঘুমোতে পারেনি। চেনাশোনা সাংবাদিকদের সঙ্গেও বহুদিন কথা বলাও বন্ধ রেখেছিল। দিল্লির ইনিংসটা আসলে মুশফিকের মাথা থেকে বড় একটা ‘বোঝা’ নামিয়ে দিল।”

ভারত সফরের আগে বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাইক্লোন বয়ে গিয়েছে। সেই ঝড়ে ক্রিকেটারদের সঙ্গে বিসিবির আস্থার ভিতই টলে গিয়েছে। দেশের ক্রিকেট সংস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। তারপরেই আইসিসির তরফে শাকিবের নির্বাসন। আসন্ন প্রসবা স্ত্রীর সঙ্গে থাকার জন্য তামিমও ভারত সফর থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। কার্যত তরুণ ব্রিগেড নিয়েই ভারত-জয়ের স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ।

আর প্রথম ম্যাচেই মুশফিকুর প্রমাণ করে দিয়েছেন। হেভিওয়েট দলের বিরুদ্ধে তিনি মহীরূহ হয়ে দলের যুব ক্রিকেটারদের আশ্রয় দিয়েছেন, ছায়া জুগিয়েছেন। দলের সিনিয়র-মোস্ট ক্রিকেটারের প্রশ্রয় পেয়ে মাঠে মেলে ধরেছেন আফিফ হোসেন, শফিউল ইসলামের মতো তরুণ তুর্কিরাও। সরকারিভাবে বাংলাদেশ দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন মাহমুদ্দুল্লা। তবে ফিরোজ শাহ কোটলার বাইশ গজে নেতৃত্বের অলিখিত শাসনভার তুলে নিয়েছিলেন মুশফিকুর।

যেভাবে দিল্লি দখল করেছেন মুশফিকুর তাতে চমকে গিয়েছে রোহিত বাহিনীও। ব্যাট হাতে নেমে একসময় আস্কিং রেট আকাশছোঁয়া হয়ে যাওয়ার পরেও কঠিন পিচে কোনও তাড়াহুড়ো করেননি। অপেক্ষা করে গিয়েছেন সুযোগের। শেষ দুই ওভারে দরকার ছিল ২২ রান। ১৯ তম ওভারে মাথা ঠান্ডা রেখে খলিল আহমেদকে শবক শিখিয়েছেন মুশফিকুর। পরিণতি আর অভিজ্ঞতা- দুয়ের মিশ্রণে জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন তিনি।

ভারত সফরের জন্য স্পেশ্যাল প্রস্তুতি কী নিয়েছিলেন? বাবা মাহবুব হামিদ বলছেন,”মুশফিক ক্রিকেট সংক্রান্ত বিষয়ে কখনই আমাদের সঙ্গে কোনও কথা বলে না। সংকল্প আর জেদ নিজের মধ্যে পুষে রাখে। ছোটবেলা থেকেই ও একেবারে অন্যরকম। আমার বাকি ছেলেদের মতো নয়। বরাবরই ও স্পেশ্যাল।” সঙ্গে প্রিয় পুত্রকে নিয়ে তাঁর আরও সংযোজন, “ও যদি এ রকম কিছু চিন্তাভাবনা করে থাকে তাহলে সেটা কাউকে জানাবে না। জানতাম ওর ভেতরে ভেতরে জেদ ছিল। বিশেষ করে বেঙ্গালুরুর ওই ম্যাচটা হার ওকে ভিতরে ভিতরে পোড়াত।”

সাকিব-তামিমকে ছাড়াই ভারত-বধ। মুশফিকের বাবা বলছিলেন, “বেশ কিছুদিন বাংলাদেশের ক্রিকেট টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে। এই হতাশা থেকে বেরোনোর জন্য ভারতের বিপক্ষে জয়ের বিকল্প আর কী হতে পারে! যখন বিমানবন্দরে মুশফিককে বিদায় জানাতে গিয়েছিলাম, তখন সৌম্য-মোসাদ্দেকরা বলাবলি করছিল, ওঁরা এবার শাকিবের জন্য খেলবে। চোখে মুখে জেদ-প্রত্যয় ঠিকরে বেরোচ্ছিল।”

সূত্র: দ্যা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা।