বৃষ্টির কৃপায়ও রক্ষা নয়, বেরিয়ে এসেছে টাইগার ক্রিকেটের অন্তঃসারশূন্য কঙ্কাল

চট্টলার আকাশের মেঘ উড়ে গিয়েছিল,বৃষ্টি বন্ধ দিয়েছিলো তার অঝোর ধারার বর্ষণ। তবে মেঘ-বৃষ্টির বিপরীত চরিত্রে টাইগার ব্যাটসম্যানরা। চতুর্থ দিনের মতো পঞ্চম দিনেও তারা ধরে রেখেছিল আসা-যাওয়ার মিছিল। এক তাইজুল আম্পায়ারের ভুল সিধান্তের বলি হওয়া ছাড়া বাকি ব্যাটসম্যানদের উইকেট বিলিয়ে আসার ঘটনা ছিল এক্কেবারে চোখে পড়ার মতো।

চট্রগ্রাম টেস্টের চতুর্থ ও পঞ্চম দিনের অনেকটাই ছিল বৃষ্টির দখলে। তবে বাংলাদেশকে যা লজ্জা দেয়ার তা আগেই কড়ায়-গন্ডায় বুঝে দিয়েছিল আফগান বোলার-ব্যাটসম্যানরা। চট্রগ্রামে কি সাবলীল ক্রিকেটেরই না প্রদর্শন দেখলো ওরা! পুরো টেস্টের কোন সময়ই মনে হয়নি বাংলাদেশ আফগানদের থেকে এগিয়ে আছে। বাংলাদেশ যা একটু এগিয়ে ছিল,তা কেবল ওই অভিজ্ঞতার বয়সের সংখ্যায়। টেস্টে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার বয়স যৌবনে,কুড়ি। অন্যদিকে আফগানরা যেন টেস্ট ক্রিকেটে সদ্য ভূমিষ্ট এক শিশু। সাগরিকায় তারা খেলতে নেমেছিল নিজেদের মাত্র তিন নম্বর টেস্ট। পুরো ম্যাচের চিত্র অবশ্য বোঝাতে পারবে না কে অভিজ্ঞ আর কেই-বা নবীন? নবীন আফগানরা কেবল বাংলাদেশকে হারিয়েই দেয়নি,কারো মতে রীতিমতো চপেটাঘাত করেছে টাইগারদের টেস্ট ক্রিকেট বোধে। কুড়ি বছরের অভিজ্ঞ আফগানদের বিপক্ষে নাকানিচুবানি খেয়ে ২২৪ রানের হার তো সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে; সম্ভবত আরোও কিছুকাল দিবে।

চট্টগ্রাম টেস্ট শুরুর আগে বেশ আলোচনায় ছিল,” কেমন উইকেট চায় টাইগাররা?” অধিনায়ক সাকিবের সোজাসাপ্টা চাওয়া ছিল, উইকেট হতে হবে এক্কেবারে স্পিন বোলিং সহায়ক। অনেকটা অস্ট্রেলিয়া,ইংল্যান্ড,উইন্ডিজকে বধ করার ফর্মুলায় রশিদ খানদের ফেলতে চেয়েছিলেন সাকিবরা। তবে সাকিবের দাবি,তিনি প্রত্যাশা মতো উইকেট পাননি। আদৌতে হয়েছেও তাই। ফলে, তিন আফগান রিস্ট স্পিনার বল যতটা ঘোরাতে পেরেছেন, টাইগার ফিংগার স্পিনাররা তার ছিঁটে-ফোঁটাও পারেননি। বোলারদের দাবি,তারা উইকেট থেকে কোন সাহায্যই পাননি। তাদের দাবি মিথ্যে নয়। বোলারদের দায়িত্ব কি তবে সবসময় উইকেট থেকে সাহায্য নিয়ে ব্যাটসম্যানদের কাবু করা! এক্ষেত্রে চোখের সামনে উদাহরণ হয়ে উঠতে পারেন রশিদ-নবীদের বোলিং কৌশল। দুই ইনিংসেই গতির হের-ফের করে ব্যাটসম্যানদের বোকা বানানোর চেষ্টা করে গেছেন আফগান বোলাররা। কখনও ঘন্টায় ৯০ কিলোমিটার গতিতে তো কখনও তা নেমে এসেছে আশিতে! আর এই গতির হের-ফেরের কৌশলে টাইগাররা ধারের কাছেও ছিল না আগফানদের।

এদিকে কেবল আফগান বোলারদের বুদ্ধিদীপ্ত বোলিংয়ের পাশাপাশি উইকেট তোলার পেছনে কৃতিত্ব আছে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের। দুই ইনিংসেই টাইগার ব্যাটসম্যানদের টেস্ট টেপারমেন্ট হারিয়ে উচ্চাবিলাসী শট খেলা কিংবা বলের মেরিট না বুঝে অহেতুক ব্যাট চালানোয় সহজেই আফগানদের ফাঁদে পড়তে হয়েছে তাদের।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট হারের পর বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্তঃসারশূন্য কঙ্কাল। এসবের পেছনে কেবল দায় কি ক্রিকেটারদেরই? বিসিবি কর্তাদের কোন দায় নেই! যেকোন ব্যর্থতার পর কোচ ছাটাই কিংবা অমুক-তমুক খেলোয়াড়কে একাদশের বাইরে রাখলেই কি সমাধান মিলবে? বিশ্বকাপ ব্যর্থতা কিংবা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে হোয়াইটওয়াশ হয়ে আসা সিরিজের রিপোর্ট এখনও জমা হয়নি বিসিবির টেবিলে। এ নিয়ে বড় কর্তাদের অবশ্য তেমন কোন ভ্রূক্ষেপও নেই। কেন টেস্ট ক্রিকেটে এত বছর পেরনোর পর একাদশে জায়গা করে নেয়ার মতো অন্তত একজন টেস্ট বোলার নেই? আফগানিস্তানের বিপক্ষে কেন পেসারদের পানির বোতল টানতে হয়? দেশের একটা উইকেটও কেন পেসবান্ধব নয়? এসব প্রশ্ন তেলার কেউ নেই,আবার উত্তরদাতাও নেই। ওদিকে অবশ্য টাইগারদের ব্যর্থতার পাল্লা ঠিকই ভারী হয়ে চলেছে।

ক্রিকেটে হার-জিত থাকবেই। সেখানে লজ্জার কিছু থাকতে পারে না। তবে আফগানিস্তানের বিপক্ষে যেভাবে টাইগাররা হেরেছে তাতে কেউ যদি এটাকে “লজ্জাজনক হার” বলে অ্যাখায়িত করে তবে তার যুক্তিখন্ডনের জন্য পাল্টা যুক্তি আপাতত নাই। সব কথার শেষ কথা হচ্ছে, এমন হারের পর বিসিবি দপ্তরে রিপোর্ট জমা পড়বে তো? হারের কারনগুলো বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য সঠিক সমাধান খোঁজা হবে তো? নাকি একে-ওকে দল থেকে ছাটাই করে বড় জয়ের স্বপ্ন নিয়ে আবারও সাদা জার্সিতে মাঠে নামবে টাইগাররা? অতীত অভিজ্ঞতা বলে দ্বিতীয়টাই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আপনি চাইলে নতুন দিনের নতুন আশায় বুক বাঁধতেই পারেন; তবে সাময়িক সাফল্যে ঢেকে থাকা টাইগার ক্রিকেটের অন্তঃসারশূন্য কঙ্কালকে কিছুতেই অস্বীকার করতে পারবেন না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here