ধ্বংসস্তুপ থেকে সফলতার শীর্ষে

লা রোসালেডায় ম্যাচের স্কোরলাইন মালাগা ৫-১ বার্সা। দর্শকরা তিরস্কার করে কোরাস গাইছে “দ্বিতীয় বিভাগে যাও-দ্বিতীয় বিভাগে যাও”!

সত্যিই ধারাবাহিক ব্যর্থতায় রেলিগেটেড হয়ে দ্বিতীয় বিভাগে চলে যাবার পথে বার্সা। ৩ দিন পর জিদান, রোনালদো, বেকহাম, ফিগো, রাউলদের নিয়ে গড়া চিরপ্রতিদ্বন্দী রিয়াল মাদ্রিদের কাছে ন্যু ক্যাম্পে আরো একটি হার।পরের সপ্তাহে
রেসিং সান্তান্দারের মাঠে আবারও ০-৩ গোলের হার।

সময়টা ২০০৩ এর ডিসেম্বর। শেষ ১০ ম্যাচে মাত্র ২ জয় নিয়ে টেবিলের ১২ নম্বরে বার্সা। কিউলরা অসহায়, ম্যানেজমেন্টেরও একই দশা। সিজন শুরুর আগে টিম ম্যানেজমেন্ট এবং পরিচালনা পরিষদে একাধিক পরিবর্তন আনেন ততকালীন প্রেসিডেন্ট লাপোর্তা।

পরপর ৪ সিজন লা লীগা বঞ্চিত দলটির দরকার ছিল একজন ভাল কোচের। ৯০ এর দশকে দুইবার লা লীগা জেতানো ভ্যান গালকে ফিরিয়ে এনে লাভ হয় নি। পছন্দের তালিকায় থাকা আয়াক্স বস সাবেক ন্যু ক্যাম্প হিরো রোনাল্ড কোয়েম্যান অনেক ব্যয়বহুল ছিল। আর্থিক ভাবে মাস্টারমাইন্ড গাস হিডিঙ্ককে আনাও সম্ভব ছিল না।

লাপোর্তা গেলেন ইয়োহান ক্রুইফের কাছে পরামর্শ নিতে। ক্রুইফ বার্সার হাল ধরার জন্য ফ্রাংক রাইকার্ডকে রিকোমেন্ড করলেন। রাইকার্ড প্লেয়ার হিসেবে লিজেন্ড হলেও কোচ হিসেবে খুব একটা সফল ছিলেন না। তবে ক্রুইফের মনে হয়েছিল প্রেসার এবং ক্রাইসিস সিচুয়েশনে রাইকার্ডই পারবে বার্সাকে পথ দেখাতে।

অনভিজ্ঞ রাইকার্ডকে বার্সার দায়িত্ব দেবার পর লাপোর্তা চেষ্টা করেছিল তখনকার সুপারস্টার ডেভিড বেকহামকে দলে ভেড়াতে। কিন্তু বেকহাম কাতালানদের পরিবর্তে বেছে নেয় রিয়াল মাদ্রিদকে। প্লান এ কাজ না করায় প্লান বি তে থাকা
পিএসজি প্লে মেকার রোনালদিনহোকে সাইন করায় লাপোর্তা।

রোনালদিনহোকে যেদিন ন্যু ক্যাম্পে উপস্থাপন করা হয় সেদিন ন্যু ক্যাম্পে উপস্থিত ২০০০০ দর্শকের পাশাপাশি প্রতিটা কিউলই
বুকে আশা বেধেছিল হয়ত এই ২২ বছর বয়সী তরুন তাদের ভাগ্য ফেরাবে। সেভিয়ার বিপক্ষে ন্যু ক্যাম্পে অভিষেক ম্যাচে ৩০ গজ দূর থেকে নেওয়া অসাধারন শটে গোল করে সে আশার প্রদীপে তেল ঢেলেছিল রোনি।

রোনালদিনহোর পর স্পোর্টিং সিপি থেকে ইয়াংস্টার রিকার্ডো কারেজমা, মোনাকো থেকে রাফায়েল মারকেজ এবং তুর্কির গোলকিপার রুস্তু রেকবারকে আনা হয়েছিল। দল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছিলো প্যাট্রিক এন্ডারসন, হুয়ান রিকুয়েলমে, ক্রিস্তানভালদের মত ফ্লপদের।

লাপোর্তার কনফিডেন্সের উপর ভরসা পাচ্ছিল কিউলরা। কিন্তু
ডিসেম্বর আসতেই সব উলট পালট হয়ে গেল।

রাইকার্ড আউট ক্যাম্পেইন শুরু হল। সান্দ্রো রোসেল চাইছিল ফিলিপে স্কোলারিকে আনতে। লাপোর্তা সেটা না করে রাইকার্ডের উপর আস্থা রাখলেন। এটা নিয়ে দুজনের মধ্যে বাঁধল বিবাদ,ভেঙ্গে গেল বন্ধুত্ব।

কিউলরা চাইছিল একজন স্ট্রাইকার। কিন্তু লাপোর্তা উইন্টার
ট্রান্সফারে কিনল জুভেন্টাসের ডিফেন্ডার এডগার ডেভিসকে।

কিন্তু ডেভিসের আগমনে শাপে বরই হল কিউলদের। ভঙ্গুর ডিফেন্স হয়ে উঠল সলিড।

চাপমুক্ত জাভি পেয়ে গেল মিডফিল্ডের স্বাধীনতা। বল সাপ্লাইয়ের পরিমান বেড়ে গেল রোনালদিনহো-লুইস গার্সিয়াদের জন্য।

রোনি, জাভি, সাভিওলার গোলে জারাগোজাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শুরু হল বার্সার প্রত্যাবর্তন। পরের ম্যাচে বিলবাওয়ের বিপক্ষে ড্রয়ের পর টানা ৫ ম্যাচ জয়। এই ৫ ম্যাচের মধ্যে ছিল এটলেটিকো মাদ্রিদ,সেভিয়া,ভ্যালেন্সিয়ার মত
শক্তিশালী দল।

পরের ম্যাচ তখনকার সময়ে ইউরোপের অন্যতম সেরা দল লা লীগার দুই নম্বরে থাকা দেপোর্তিভোর সাথে। প্রতিদ্বন্দিতাপূর্ন ম্যাচে তাদের মাঠে বার্সা জয়লাভ করে ৩-২ গোলে। জোড়া গোল করেন রোনালদিনহো।

খেলার ধরণ থেকে শুরু করে টীম স্পীরিটের আমুল পরিবর্তন। টেবিলের ৪ নম্বরে উঠে আসলো বার্সা।

২৪ এপ্রিল আবারও এল ক্ল্যাসিকো মাঠে গড়ানোর দিন এলো; ফিরতি লেগে বার্নাব্যুতে প্রতিশোধের ম্যাচ খেলতে গেল বার্সা। শুরুতেই গোল খেয়ে পিছিয়ে গেলেও সমতায় ফেরান প্যাট্রিক
ক্লুইভার্ট।

৮৭তম মিনিটে রোনালদিনহো ম্যাজিক! অসধারণ লফটেড পাস থেকে জাভির লক্ষ্যভেদ। ২-১ গোলের জয়ের সাথে টানা ১৬ ম্যাচ অপরাজিত। পয়েন্ট তালিকার ৩ নম্বরে উঠে আসলো রেলেগেশনের আশঙ্কায় থাকা বার্সা।

পরের সপ্তাহে এস্পানিওলকে হারানো সত্ত্বেও সেল্টা ভিগোর কাছে হেরে গিয়ে শীরোপা হারাতে হয় বার্সাকে। টাইটেল জিতে নেয় রাফা বেনিতেজের ভ্যালেন্সিয়া।

অসাধরন ফর্ম ধরে রেখে পরের বছর ঠিকই লা লীগা জিতে নেয় বার্সা। আর তাতে নতুন সাইনিং স্যামুয়েল ইতো, লুডোভিক জিউলি এবং ডেকো পুরনোদের ভালভাবেই সাহায্য করেন। আর এই সিজনেই অভিষেক হয় লম্বা চুলের ছোটখাটো
গড়ণের এক ক্ষুদে জাদুকরের।

সাফল্য পরের সিজনে চূড়ান্ত শিখরে পোছায় যখন বার্সা লা
লীগার পাশাপাশি প্যারিসে আর্সেনালকে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে হারিয়ে ইউরোপসেরা হবার যোগ্যতা অর্জন করে।

২০০৩-০৪ সিজনে বার্সা কোনো ট্রফি জিততে পারে নি। তবুও বার্সার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ন সিজন ছিল ২০০৩-০৪।কারন এই সিজনে বার্সা ধংসস্তুপ থেকে বেরিয়ে সফলতার
শীর্ষবিন্দুর জন্য লড়াই করতে শিখেছিলো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here