পেপ-মৌঃ একবিংশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক দ্বৈরথ

একবিংশ শতাব্দীর ফুটবল দ্বৈরথের সবচেয়ে আলোচিত সমালোচিত যুদ্ধের নায়ক পেপ-মৌ। এই যুদ্ধের তীব্রতা এই দু’জনকে ছাপিয়ে ছড়িয়েছে দুটি ক্লাবের সকল সদস্যদের মধ্যে, অন্তঃকোন্দলে সাম্যতা হারিয়েছিল স্পেন জাতীয় ফুটবল দলের। আসুন জেনে নেই পেপ-মৌ দ্বৈরথের সূচনা যেভাবে হয়েছিল।

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার শুরু হয়েছিল ‘৯০ এর শেষ দিকে স্যার ববি রবসনের বার্সেলোনা আমলে। সেসময় বার্সেলোনার অধিনায়ক ছিলেন পেপ গার্দিওলা। লিজেন্ডারি কোচ রবসন একজন অনুবাদককে নিয়ে এলেন ন্যু ক্যাম্পে। যাতে করে সহজেই স্প্যানিশ ফুটবলারদের সাথে ম্যাচ রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা করা সহজ হয়। এজন্যই তিনি এক তরুণ এবং প্রতিভাবানকে সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিলেন। তার নাম হলো হোসে মরিনহো।

ছবিতে রয়েছেন বাম থেকে→ চার্লস বুস্কেটস, লুইস এনরিকে, হোসে মরিনহো এবং পেপ গার্দিওলা

স্যার ববি রবসন জানতেন না যে, তিনি হোসে মরিনহোকে একজন ম্যানেজার হয়ে গড়ে ওঠার জন্য প্রথম সুযোগটা করে দিলেন এবং এটাই ছিল প্রথম মুহূর্ত যখন পেপ গার্দিওলা এবং হোসে মরিনহোর মধ্যে প্রথম বারের মত সাক্ষাৎ হয়। এই সময়ে মরিনহো একজন পেশাদার ম্যানেজার হওয়ার প্রথম শিক্ষাটা পেতে থাকলেন। তিনি গার্দিওলার সাথে খুব ভালো বন্ধুত্ব স্থাপন করলেন। দুজনে মিলে বার্সায় থাকাকালীন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিরোপাও জিতেছিলেন।

কিন্তু মরিনহো সহকারী হিসেবে নয় বরং নিজেই নিজের ইতিহাসকে আরও বড় জায়গায় নিতে চাইলেন। হতে চাইলেন স্বয়ং একজন পেশাদার ম্যানেজার। তাই নিজের ভাগ্য ফেরাতে চলে গেলেন স্বদেশ পর্তুগালে। এরপরই গার্দিওলা এবং মরিনহোর পথ দুই দিকে চলে গেল। অনেক বছর পরে দুজনের অজান্তেই তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে এলো সকলের সামনে।

পেপ গার্দিওলা ম্যানেজার হওয়ার দৌড় শুরু করার আগেই মরিনহো তার সফলতার মুখ দেখে ফেলেছিলেন! পর্তুগিজ এই কোচ বিশ্বের অন্যতম সেরা কোচের তকমা পেয়েছিলেন এফসি পোর্তোকে চ্যাম্পিয়নস লীগ শিরোপা জেতানোর মাধ্যমে। এরই সাথে তিনি চেলসির জরাজীর্ণতা কাটিয়ে বিশ্বের শক্তিশালী ফুটবল ক্লাবে পরিণত করেছিলেন।

বার্সেলোনার কোচ হওয়ার জন্য মরিনহো সম্ভাব্য সকল কিছুই জয় করেছিলেন। কাতালানদের ক্লাব ছাড়ার সময়ই তিনি এই ক্লাবের ম্যানেজার হওয়াটাকে জীবনের লক্ষ্য করে নিয়েছিলেন।
কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তিনি কখনোই বার্সেলোনার ম্যানেজার হতে পারবেন না। ঘটনাটি ঘটেছিল ২০০৮ এর গ্রীষ্মে, কাতালন ক্লাবের বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মরিনহোর পরিবর্তে বার্সেলোনা ক্লাবের ম্যানেজার হলেন পেপ গার্দিওলা।

ন্যু ক্যাম্পে মরিনহো এবং গার্দিওলা

এই প্রসঙ্গে বার্সেলোনা ক্লাবের প্রেসিডেন্ট জানালেন, পর্তুগিজ ম্যানেজার মরিনহোর ফুটবল দর্শন এবং বার্সেলোনার দর্শন ভিন্ন। অন্যদিকে বার্সেলোনার সাথে গার্দিওলা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তার ফুটবল ক্যারিয়ার এবং ব্যক্তিত্বের সাথে কাতালানদের নিবিড় যোগাযোগ আছে।

মরিনহো প্রত্যাখ্যিত হওয়াটা মানতে পারেননি এবং তিনি চেয়েছিলেন বার্সেলোনাকে ফুটবলের ইতিহাসে পরাজিত করে দেখিয়ে দেবেন এবং তিনি সেটা করেও দেখিয়েছেন।

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামনে আসে ২০০৯-১০ মৌসুমে। মরিনহো তখন ইন্টার মিলানের কোচ। চ্যাম্পিয়ন লীগের সেমি ফাইনালে সেসময়ের শক্তিশালী বার্সেলোনাকে বিদায় জানিয়ে ফাইনালে চলে যায় মরিনহোর ইন্টার মিলান। বার্সেলোনার ক্যাম্প ন্যু-তে বার্সার এই হারের পর জানালেন তিনি তার জীবদ্দশায় কখনোই বার্সেলোনার কোচ হবেন না।এরপরই এই দুই বিখ্যাত কোচের প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্ম। দুই ব্যক্তির সমান সমান সফলতা কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে।

ঠিক সেই মৌসুমে ইন্টার মিলানকে ট্রেবল জিতিয়ে চলে এলেন বার্সেলোনার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদে। তখন শুরু হল পেপ-মৌ যুদ্ধ। গার্দিওলা এটা পছন্দ করেননি কিভাবে দুই কোচের দ্বন্দ্ব দুটো ক্লাবের স্কোয়াডে ছড়িয়ে পড়েছিল ভয়ংকরভাবে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় স্পেনের জাতীয় দলের ভ্রাতৃত্ববোধ ভেঙে গিয়েছিল। পরবর্তীতে জাতীয় দলের অধিনায়কের সাহসী সিদ্ধান্তে জাতীয় দল দুই ম্যানেজারের দ্বন্দকে পাত্তা না দিয়ে পুনরায় ঘুরে দাঁড়িয়েছিল।

২০১১-১২ মৌসুমে মরিনহো লালীগা জিতে নেয়। সে মৌসুমে কাতালান বোর্ড পেপ কে ম্যানেজারের পদ থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেয়। বার্সা থেকে ছিটকে পড়ে পেপ পাড়ি জমান জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখে। পরের মৌসুমের পরই অর্থাৎ ২০১৪ তে মাদ্রিদ ছেড়ে মরিনহো পুনরায় চেলসিতে ফিরে যান। ২০১৬ তে পেপ সিটিতে ফিরে এলেন।

এভাবেই দুই কোচ তাদের দ্বন্দ্বকে প্রিমিয়ার লীগেও টেনে এনেছিলেন। পেপ হলেন ম্যানচেস্টার সিটির ম্যানেজার আর ম্যানচেস্টার এর আরেক দল ইউনাইটেডের ম্যানেজার হলেন মরিনহো। তবে, ইউনাইটেডের ভাঙাচোরা দল নিয়ে তেমন ইতিবাচক কিছু করতে না পেরে বরখাস্ত হয়েছেন। এই দুজনের দ্বৈরথ শুধু মাঠেই ছিলনা, মাঠের বাইরে প্রেস বক্সে এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতেও ছড়িয়েছিল বাক যুদ্ধ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here