বাংলাদেশ ক্রিকেটে সাকিবের “তেরোটি বসন্ত” ও যতসব অর্জন

ছবি সংগ্রহিত।

সালটা ২০০৬ আর দিনটা আজ। মানে ৬ই আগস্ট ২০০৬ বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় একটি ছেলের। হালকা পাতলা শরীরের ছেলেটির নাম সাকিব আল হাসান।

সেই সাকিব আল হাসান এখন আমাদের একজন জীবন্ত কিংবদন্তী। সাকিব আল হাসান এখন একটি অনুপ্রেরণার নাম। সেই দিন থেকে ধীরে ধীরে সাকিব দলের প্রাণ হয়ে উঠেন। আস্তে আস্তে রেকর্ড বুকে নিজের নাম লেখাতে শুরু করেন।

র‍্যাংকিং-এ তখন অন্যান্য দেশের খেলোয়াড়দের নাম দেখতে হতো,আস্তে আস্তে নিজের নাম কে সাকিব তাদের উপরে নিয়ে যেতে থাকেন। হয়ে উঠেন ওয়ার্ল্ড নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার। বিশ্ব ক্রিকেটে এক পরিচিত মুখ এখন আমাদের ঐ সাকিব আল হাসান।

একজন সাকিব আল হাসান এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট, একে অপরের পরিপূরক। বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ সাকিব আল হাসান। ক্যারিয়ারের ১৩ বছরে দেখেছেন অনেক উত্থান পতন, সাক্ষী হয়ে আছেন অনেক রথী মহারথীর,আবার হয়ে উঠেছেন ক্রিকেটের তিন সংস্করণের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার! যার ফলস্রুতিতে পেয়েছেন ’দ্য ওয়ান ম্যান আর্মি, রান রানওয়ে লিডার উপাধি।

ছবি: সংগ্রহিত।

যার জন্মই হয়েছে রেকর্ড করার জন্য, সেই রেকর্ড আল হাসান। এই মানুষটাই আমাদের দেখিয়েছেন যে ক্রিকেটে কোন কিছুতে আমরা এক নাম্বার হতে পারি… এই মানুষটা দেখিয়েছে তিন ফরম্যাটেই এক নাম্বার অল রাউন্ডার হওয়া যায়… এই মানুষটাই আমাদের ক্রিকেট রূপকথার রাজপুত্র.. এই মানুষটা সব সময় বিতর্কিত…।

সাকিবকে নিয়ে লেখা শুরু করলে শেষ হবে না! তারপরও গত ১৩ বছরের কিছু স্মৃতি তুলে ধরলাম

সাল ২০০৬ঃ
অভিষেক এক ক্ষুদ্র জাদুকরের।
ব্যাটসমান অলরাউন্ডার হিসেবে অভিষেক।

সাল ২০০৭ঃ
বিশ্বকাপে ভারতের বিরুদ্ধে জিতার জন্য অবদান স্বরুপ করলেন ৫০ রান৷ তখনই বোঝা যাচ্ছিল ছেলেটা হবে বাংলাদেশের তুরুপের তাস।

সাল ২০০৮ঃ
ওয়ানডে আর টেস্টে নিজেকে মেলে ধরার চেষ্টা করছেন, সাফল্যও পাচ্ছেন। নিজেকে প্রমাণ করে যাচ্ছেন সব ফরম্যাটে।

সাল ২০০৯ঃ
পত্রিকায় বড় করে ছবিসহ হেডলাইন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার বাংলাদেশের সাকিব। নিজেকে নিয়ে গেলেন অন্যন্যা উচ্চতায়, আর সাথে বাংলাদেশকেও। শ্রীলংকার সাথে ৯২* অপরাজিত ম্যাচ জেতানো ইনিংসটা আজো চোখে ভাসে আহ কি ব্যাটিংটাই না করেছিলো সেদিন।

সাল ২০১০ঃ
হঠাৎ করেই মাঠেই ক্যাপ্টেন্সি পাওয়া আর সে হঠাৎ করেই ক্যাপ্টেন্সি পেয়ে করলেন নিউজিল্যান্ড এর মতো পূর্ণশক্তির দলকে হোয়াইটওয়াশ। নিজে পেলেন সিরিজ সেরার পুরস্কার। আর তার নেতৃত্বে দেশের বাইরে প্রথম টেস্ট জয়ের স্বাদ পেলাম আমরা।

সাল ২০১১ঃ
দেশের মাটিতে বিশ্বকাপে ছয়ম্যাচের তিন ম্যাচ জিতলাম। শক্তিশালী ইংল্যান্ডকে হারালাম সাকিবের নেতৃত্বে। প্রথমবারের মতো আইপিএলে সাকিব সাকিব গর্জন শুনা গেল।

সাল ২০১২ঃ
এশিয়া কাপে তিনটা ফিফটি একটা ৪৯ রান সাথে কিছু উইকেট। বাংলাদেশ টিম ফাইনালে। ফাইনালে ২ রানে তিক্ত হারে দেখা পেলাম বাংলাদেশের ইমোশনাল সাকিব।

সাল ২০১৩ঃ
সাকিবের এগ্রেসিভনেস আরো বাড়তে থাকলো। জিতলেন ঢাকার পক্ষে বিপিএল শিরোপা। সাকিব দেশের বাইরে সব লীগে খেলা শুরু করলেন।

সাল ২০১৪ঃ
দেশের ক্রিকেটের খারাপ সময় গেলেও ছিলেন তিনি ফর্মে। দেশের বাইরে আইপিএলে দূর্দান্ত ফর্মে জিতেছিলেন আইপিএলের দ্বিতীয় শিরোপা। এছাড়াও নিজে ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞা পেয়েছিলেন আবার ফিরেছিলেন রাজার মতো। পাকিস্তানের সাথে ফেরা ম্যাচে ১৬ বলে ৪৪ রানের ইনিংস

সাল ২০১৫ঃ
পরিণত সাকিব হলেন তিন ফরম্যাটে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। খেলেন প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে কোয়াটার ফাইনাল।

সাল ২০১৬ঃ
এশিয়া কাপের ফাইনালে বাংলাদেশ।
সাকিবের বোলিং জাদুতে ইংল্যান্ডকে দেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো টেস্টে হারালাম।

সাল ২০১৭ঃ টেস্টে করলেন ২১৭ রান নিউজিল্যান্ড এর মাটিতে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে পেলেন এক ম্যাচে ১০ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব। দেশকে আনন্দে ভাসালেন ইতিহাস গড়ে।

সাল ২০১৮ঃ
বাংলাদেশের মাটিতে ত্রিদেশীয় সিরিজে প্রথম তিন ম্যাচেই করলেন দুর্দান্ত শুরু। দুই ম্যাচেই পেলেন ম্যান অব দ্যা ম্যাচ। বাংলাদেশ আবার ফাইনালে চতুর্থ ম্যাচে পরলেন ইঞ্জুরির কবলে আর হারলো বাংলাদেশ ফাইনালেই। কিছুদিন পর আবার ইঞ্জুরি নিয়ে শ্রীলংকা উড়ে গেলেন দলকে শিরোপা জেতাতে। সাকিবের হাত ধরে মাহমুদুল্লাহার ব্যাটে ভর করে অঘোষিত সেমিফাইনাল জিতে গেলাম। ইন্ডিয়ার বিপক্ষে ফাইনালে ভাগ্যের কাছে হারলাম।

সাল ২০১৯ঃ
বিশ্বকাপের ফটোসেশনে নেই সাকিব আল হাসান। শেষ পর্যন্ত পুরো বিশ্বকাপটাই বাংলাদেশের হয়ে খেললেন সাকিব আল হাসান। সপ্নের একটা বিশ্বকাপই ছিলো বলা যায়। ৬০০+ রান ১১ উইকেট। এবারের বিশ্বকাপ বাংলাদেশকে কিছুই দেয়নি দিয়েছে সাকিবকে।

ছবি: সংগ্রহিত।

ম্যাথু হেইডেন একবার ওয়াটসনের খারাপ ফর্ম প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন “Everyone can’t be Jaque Kallis or Shakib Al Hasan”

মাশরাফি একবার বলেছিলেন “অনেকের অনেক প্রতিভাই থাকে। সাকিবের যা আছে সেটা প্রকৃতিপ্রদত্ত ট্যালেন্ট নয়, আজ ও এই অবস্থানে ওর নিজের কঠোর পরিশ্রম দ্বারা” ।

জ্যাক ক্যালিস বলেছিলেন, সাকিবের বিপক্ষে আপনি যখনই খেলবেন, আপনাকে প্রস্তুত থাকতে হবে, সে যেকোন ভূমিকায় ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে। আমার মনে আছে, ও দক্ষিণ আফ্রিকায় এসে আমাদের বিপক্ষে পরপর দুই টেস্টে ৫ উইকেট নিয়েছিল। এটা বিরাট ব্যাপার। বড় স্পিনাররাও এখানে এসে এত সাফল্য পায়না, এখানকার উইকেট স্পিনারদের জন্য নয়। আমি সৌভাগ্য যে কেকেআরে আমরা একসঙ্গে খেলেছি। মানুষ হিসেবে সে আমাকে মুগ্ধ করেছে সব সময়”।

ওয়াসিম আকরাম: একজন অলরাউন্ডার হিসেবে তার পরিসংখ্যানই তাকে চেনানোর জন্য যথেষ্ট। কিন্তু আমি তাকে দেখি একজন গেম চেঞ্জার হিসেবে। সে খাঁটি ম্যাচ উইনার”

শিল্ড বেরি (সাবেক সম্পাদক, উইজডেন): সাকিবকে সবাই পেতে চাইবে”

সঞ্জয় ম্যানজেকার :সাকিব সম্পর্কে আমার প্রথম ধারণাটাই ছিল এই ছেলে বিশ্বের যেকোন প্রথম সারির টেস্ট দলে জায়গা করে নিতে পারে”

অলরাউন্ডার যদি হতে হয় তাহলে ক্যালিসের মত হও…
অলরাউন্ডার যদি হতে হয় তাহলে ফ্লিনটফের মত হও…
অলরাউন্ডার যদি হতে হয় তাহলে ওয়াটসনের মত হও…

তিন ফর্মেটে একই সাথে বিশ্ব সেরা অল রাউন্ডার যদি হতে হয় তাহলে সাকিব আল-হাসানের মত হও।

২০৬ ওয়ানডেতে ১৯৪ ইনিংসে ৩৭+ এভারেজে ৮২+ স্ট্রাইকরেটে ৬৩২৩ রান। ফিফটি ৪৭ টি সেঞ্চুরি ০৯ টি। সর্বোচ্চ ১৩৪।

বল হাতে সাকিব ২০৬ ওয়ানডেতে ২০৩ ইনিংসে ২৬০ উইকেট। পাঁচ উইকেট পেয়েছেন ২ বার।

ওয়ানডেতে সাকিবের কিছু রেকর্ডনামাঃ

* প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে চার হাজার রান।

*২য় বাংলাদেশী হিসেবে পাঁচ হাজার ও ছয় হাজার রান

* ২য় বাংলাদেশী হিসেবে ওয়ানডেতে ২৫০ উইকেটের মালিক

* প্রথম বাংলাদেশী স্পিনার হিসেবে ওয়ানডেতে ২৫০ উইকেট

* শচীন টেন্ডুলকার ও ম্যাথু হেইডেনের পর তৃতীয় প্লেয়ার হিসেবে এক বিশ্বকাপে ৬০০ রান করেন সাকিব

* বিশ্বকাপে হাজার রান ও ৩০ উইকেট নেয়া একমাত্র প্লেয়ার

* ২০০৭,১১,১৫,১৯ প্রতিটা বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ব্যাট হাতে ফিফটি

* প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে বিশ্বকাপে এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট

* বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচসেরা সবচেয়ে বেশি সিরিজ সেরার পুরস্কারের মালিকও সাকিব আল হাসান

* বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে ছোট রান সাকিবের সবচেয়ে বেশিবার ম্যাচসেরাও সাকিবের

* ওয়ানডেতে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রানের জুটির মালিক সাকিব আল হাসান ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ২২৪

আরো বহু রেকর্ড আছে সাকিবের নামে। এখানে শুধু ওয়ানডের কয়েকটা।

২০১৪ সালে সাকিবকে যখন ব্যান দেয়া হয় তখন বিসিবি সভাপতি বলেছিলো সাকিবের বেয়াদবীর প্রভাব অন্য ক্রিকেটারদের উপর এসে পড়ছে। আফসোস সাকিবের মতো বেয়াদবী বজায় রেখেও মাঠে সেরা পারফর্ম আর কেউ করতে পারেনা। এক সাকিব যেদিন ফ্লপ সেদিন বাংলাদেশ ফ্লপ।

ক্যারিয়ারের ১৩ বছর শেষ। ১৩ বছরে নিজের নামের পাশে যতগুলো রেকর্ড জমিয়েছেন আর বাংলাদেশ ক্রিকেটকে যা দিয়ে গেছেন তার জন্য লেখতে বসলে ডায়রী কয়টা লাগবে জানা নাই। সরাসরি বইলা দেই এই বাংলার ক্রিকেটে সামনে আরে ভালো প্লেয়ার আসবে ভালো বোলার ভালো ব্যাটসম্যান আসবে কিন্তু আরেকটা সাকিব??? ঐটা আর বাংলাদেশের ক্রিকেটে আসবেনা।

আজ থেকে ১৩ বছর আগে বাংলার ক্রিকেটে একটা রাজার আগমন ঘটেছিলো বাংলাদেশ ক্রিকেটে। ১৩ বছরে সেই রাজা বাংলার ক্রিকেটকে যা দিয়ে গেছেন তা শুধু বাংলার ক্রিকেট না বিশ্বের ক্রিকেটই মনে রাখবে।

ক্যারিয়ারের ১৩ তম বর্ষপূর্তির শুভেচ্ছা মিস্টার অলরাউন্ডার সামনের দিনগুলো ভালো কাটুক। শুভ হোক আগামীর যাত্রা।

এত সবকিছুর জন্য সাকিব আল হাসানকে ধন্যবাদ।

লেখাটি সংগ্রহিত: আশিকুর রহমান সোহেল (ক্রিকসেল)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here