রিয়াল মাদ্রিদ ১১-১ বার্সেলোনাঃ এক লজ্জার ইতিহাস

আড্ডাস্থলে আমরা যখন কিউল আর মাদ্রিদিস্তারা তর্ক লাগি তখন মাদ্রিদিস্তারা তাদের প্রধান অস্ত্র প্রদর্শন করে এই বলে, “আমাদের ১৩ টা ইউসিএল আর ৩৩ টা লা-লীগা আছে, আগে সমানে সমান আসো!” কথাটা শোনার সাথে সাথে হয় বার্সা ফ্যানদের মুখ রাগে কালো হয়ে যেতো নয়তো এলোপাথারি উজবুকি শুরু করে দিতো! আসলেইতো, এটার চেয়ে ঈর্শ্বনীয় কি হতে পারে! যে ইউসিএল জেতার জন্য বর্তমান ধনী ক্লাবগুলো পানির মতো টাকা খরচ করছে, তারা সেটা অনায়াসে জিতেছে ১৩ বার! শুধুতো তাদের ১০০ মিলিয়নের ভেতরে কিনা ক্রিশ্চিয়ানো যুগেই ৪ বার জিতে ফেলেছে তারা! আর বার্সেলোনা সারা ইতিহাস জুড়ে কুড়েখুড়ে জুগিয়েছে মাত্র ৫ খানা! এই যুক্তিটা ছাড়াও মাদ্রিদিস্তারা আরেকটা যুক্তি দেয় মাঝে মাঝে। তারা বলে যে আমরা বার্সেলোনাকে ১১-১ গোলে হারাইছি! তাই আমরাই সেরা। আগের যুক্তিটার বিপরীতে এই যুক্তিটা অত্যন্ত নির্বুদ্ধিতার পরিচয় হবে যদি না আপনি জানেন এই ম্যাচের পেছনের কাহিনীটি!

১৯৪৩ এর কোপা দেল জেনারেলিজিমো এর সেমি ফাইনালে বার্সেলোনা মুখোমুখি হয় তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দী রিয়াল মাদ্রিদের! চারিদিকে উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে। কি হবে রেজাল্ট! কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। স্পেনের একটি প্রধান এলাকার নাম কাতালুনীয়া। বার্সেলোনা কাতালুনীয়ার রাজধানী, অনেকদিন ধরেই তারা স্পেনের কাছে স্বাধীনতা চাচ্ছে কিন্তু স্পেনের সরকার তাদের পদদলীত করে রেখেছে। আজ সুযোগ এসেছে স্পেনের রাজধানীর প্রান রিয়াল মাদ্রিদ কে হারিয়ে স্পেনিশদের ওপর আরেকবার ছড়ি ঘোরানোর। গোটা স্পেন তখন ছিলো একনায়ক ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো এর একনায়কতন্ত্রের পতাকা তলে! যাদের সব থেকে বাজে পরিস্থিতীতে ছিলো কাতালুনীয়ানরা। সেমি ফাইনাল হবে দুই লেগে, প্রথম লেগে বার্সেলোনা ৩-০ গোলে জিতে এক পা দিয়ে রাখলো ফাইনালে! কাতালুনীয়ানদের মাঝে খুশির ঢেউ! দ্বীতিয় লেগে ৩-০ এডভান্টেজ নেয়া বার্সাকে পেছনে ফেলা প্রায় অসম্ভব মাদ্রিদের জন্য! দ্বিতীয় লেগ রিয়ালের হোম গ্রাউন্ড। ১৯ জুন ১৯৪৩ বার্সেলোনা পৌছে গেলো মাদ্রিদের হোম গ্রাউন্ড এস্তাদিও চ্যামার্টিন এ! হঠাৎ তাদের রুমে আসলেন ফ্রাঙ্কোর ডিষ্ট্রিক সিকিউরিটির হেড, তিনি এসে বার্সা ড্রেসিং রুমের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমাদের মনে করিয়ে দেই, তোমরা আজ শুধু খেলবে শাসকের তোমাদের প্রতি উদারতার কথা ভেবে! কিছুক্ষনের মধ্যে ফ্রাঙ্কো স্বয়ং নিজে যোগ দেন বার্সা ড্রেসিং রুমে। তিনি সকলকে সাফ জানিয়ে দিলেন, আমি এখানকার বস এবং আমার শাসনের নীচে থাকা সবাই সমান এমনকি তোমরা প্লেয়াররাও! আর তোমরা জিতলে আশা করি কেউ আর আগামীকালের সূর্যদয় দেখতে পারবে না!! ম্যাচ শুরু হবার ৪৫ মিনিটের মাথায় স্কোর ৮-০! ম্যাচের ৯০ মিনিট পরে দেখা গেলো ১১-১ এ জিতে এবং ১১-৪ এগ্রিগেন্টে ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদ!!! ম্যাচে রিয়ালের হয়ে গোল করেন প্রুডেন (৫,৩২,৩৫), বারিনাগা (৩০,৪২,৪৪,৮৭), আলোনসো (৩৭,৭৪), কুর্টা (৩৯), বোটেল্লা (৮৫)
বার্সার পক্ষে একমাত্র গোলটি করেন মার্টিন (৮৯) ফুটবলের কালো অধ্যায়গুলোর একটি এটিও, এটি ছাড়াও রিয়াল মাদ্রিদ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব মাঠে প্রমান করেছে বারবার। কে জানে যদি বার্সেলোনা কাতালুনীয়ায় না হতো তবে তাদের ইতিহাসটা আরও সমৃদ্ধ হতে পারতো! এমনও হতে পারতো কাতালুনীয়ার রাজধানী না হলে বার্সেলোনা নামের কোনো ক্লাবের জন্মই হতো না!! এতোগুলো মানুষকে দিনশেষে হাসাতে কাদাঁতে পারতো না! ফুটবলটা এতোটা রঙ্গিন হতোনা!?!