ভারতের সর্বকালের সেরা অধিনায়ক ধোনির পাশেই কোহলি

অধিনায়ক ও ব্যাটসম্যান হিসেবে বিরাট কোহালির পরিসংখ্যান নিয়ে ঝড় আরও বাড়িয়ে দিলেন রবি শাস্ত্রী। চার দিনে টেস্ট জেতার পরের দিন গলের সমুদ্রের শোভা নিতে নিতে ভারতীয় দলের হেড কোচ বলে দিলেন, ‘‘ক্যাপ্টেন কোহালি যে ভাবে এগোচ্ছে, ভারতের সর্বকালের সেরা অধিনায়ক হিসেবে মহেন্দ্র সিংহ ধোনির পাশে বসে পড়লেও অবাক হব না। বিরাটের সেই যোগ্যতা আছে।’’

সর্বকালের সেরা ভারত অধিনায়ক কে, তা নিয়ে প্রচুর তর্ক-বিতর্ক আছে। কিন্তু শাস্ত্রী মনে করেন, ধোনিই সর্বকালের সেরা ভারত অধিনায়ক। ‘‘ছেলেটার দু’টো বিশ্বকাপ আছে। একটা টি-টোয়েন্টি, একটা পঞ্চাশ ওভারের। সঙ্গে একটা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল, একটা টি-টোয়েন্টি এবং একটা পঞ্চাশ ওভারের বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল,’’ বলেই শাস্ত্রী সটান স্টেপ আউট করলেন, ‘‘এই যে লোকে খালি ওর ওয়ান ডে সাফল্যের কথা বলে, একটু মিলিয়ে নেবেন তো ধোনির টেস্ট রেকর্ডটা কেমন। ভারতের সেরা অধিনায়কদের সঙ্গে রেকর্ডের তুল্যমূল্য বিচারে ধোনি কোথায় আর অন্যরা কোথায়— এটা পরিসংখ্যান ঘেঁটে একটু দেখে নেবেন তো। বিরাটকে দেখে আমার মনে হচ্ছে, ও সেই জায়গাটায় পৌঁছবে।’’

গলের মাঠ যদি সৌন্দর্যের দিক থেকে ফতেপুর সিক্রি হয়, গলের টিম হোটেল হল চাঁদনি রাতের তাজমহল। স্পা এবং সুইমিং পুল সংলগ্ন এলাকায় প্রাইভেট বিচ রয়েছে হোটেলের। সেই বিচে স্নান করতে নামা নিষিদ্ধ হতে পারে কিন্তু আদর্শ ট্যুরিস্টের মতো বসে চাপমুক্ত মনে সমুদ্রের শোভা উপভোগ করা যায়। শাস্ত্রীর সঙ্গে তখন বসে আছেন বোলিং কোচ ভরত অরুণ। কোচ বিতর্কের মতো বোলিং কোচকে নিয়েও জলঘোলা কম হয়নি। আগের বার এসে হেরে যাওয়া গলে চার দিনে টেস্ট জেতায় দু’জনকেই বেশ ফুরফুরে দেখাল। আর সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ার মধ্যে শাস্ত্রী অধিনায়কত্ব নিয়ে ঢেউ তুলে দিলেন।

সর্বকালের সেরা ভারত অধিনায়ক হওয়ার ক্ষমতা ধরেন কোহালি—এই তর্ক প্রথম কেউ তুলল। কাকতালীয় হচ্ছে, ধোনি এবং কোহালি দু’জনকেই অধিনায়ক হিসেবে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা রয়েছে শাস্ত্রীর। প্রথম যখন ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দেন ২০১৪ সালে, ধোনি ছিলেন অধিনায়ক। এখন কোহালি সব ফর্ম্যাটের অধিনায়ক।
পরিসংখ্যানের দিক থেকে অন্তত শাস্ত্রী খারাপ কিছু বলেননি। পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, জয়ের শতকরা হারের দিক থেকে এই মুহূর্তে ভারতের সব চেয়ে সফল অধিনায়কের নাম কোহালি। গলে ছিল অধিনায়ক হিসেবে তাঁর ২৭তম টেস্ট। এই ২৭টি টেস্টে তিনি জিতেছেন ১৭টিতে। জয়ের হার ৬২.৯৬ শতাংশ। ২০টির বেশি টেস্টে নেতৃত্ব দেওয়া কোনও ভারত অধিনায়কের এত উচ্চ জয়ের শতকরা হার নেই। যদিও কথা উঠতে পারে যে, সে ভাবে এখনও বিদেশের মাঠে কঠিন সফরে যাননি নেতা বিরাট।

অতীতের সেরাদের সঙ্গে তুলনা করা যাক। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের রয়েছে ৪৯ টেস্টে ২১ জয়। জয়ের শতকরা হার ৪২. ৮৫। কপিল দেবের ৪ জয় ৩৪ টেস্ট থেকে। জয়ের শতকরা হার ১১.৭৬। সুনীল গাওস্কর ৪৭ টেস্টে অধিনায়কত্ব করেছেন। জয়ের সংখ্যা ৯। জয়ের শতকরা হার ১৯.১৪। মহম্মদ আজহারউদ্দিন ৪৭ টেস্টে অধিনায়কত্ব করে ১৪টি জিতেছেন। জয়ের শতকরা হার ২৯.৭৮। মহেন্দ্র সিংহ ধোনিই টেস্টে পরিসংখ্যানের দিক থেকে সব চেয়ে সফল ভারত অধিনায়ক। ৬০টি টেস্টে অধিনায়কত্ব করে তিনি জিতেছেন ২৭টি। জয়ের শতকরা হার ৪৫। আজহার, সৌরভের চেয়েও এগিয়ে।

শাস্ত্রী সব অঙ্ক-টঙ্ক শুনে বলে উঠলেন, ‘‘বিরাট যে ভাবে এগোচ্ছে, ধোনিকে ধরে ফেলতে পারে। পঁয়ত্রিশ বছর ধরে ক্রিকেটের সঙ্গে মিশে রয়েছি। হয় নিজে খেলেছি, নয় কমেন্ট্রি করেছি, নয়তো কোচ হিসেবে ড্রেসিংরুমের বারান্দায় বসেছি। সচিন ছাড়া আর কাউকে এমন ভাবে রেকর্ড দুমড়ে দিয়ে এগোতে দেখিনি। ছেলেটা অর্ধেক টেস্ট খেলে অনেক কিংবদন্তি আর তারকাদের রেকর্ড ধরে ফেলছে। কোথায় গিয়ে থামবে কে জানে!’’

সমসাময়িক ক্রিকেটারদের মধ্যে টেস্টে কোহালির নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কে? বিশ্ব ক্রিকেটের নাড়িনক্ষত্র সম্পর্কে ওয়াকিবহাল শাস্ত্রী এ বারও সময় নিলেন না। বলে দিলেন, ‘‘স্টিভ স্মিথ। অধিনায়ক হিসেবে ওর ব্যাটিং রেকর্ডও দারুণ।’’ একদমই ঠিক। অধিনায়ক হিসেবে স্মিথের ব্যাটিং গড় ৭৩.২৭। তাঁর আগে শুধু ডন ব্র্যাডম্যান (অধিনায়ক হিসেবে ব্যাটিং গড় ১০১.৫১)। তার পরেই তিন নম্বরে রয়েছেন কোহালি। অধিনায়ক হিসেবে তাঁর ব্যাটিং গড় ৬১.০৯। আগামী এক বছর স্মিথ বনাম কোহালি ‘স্টারওয়ার্স’ আরও জমজমাট রূপ ধারণ করতে চলেছে।

এটা ঠিকই যে, পরিসংখ্যান দিয়ে সমস্ত কিছু বিচার করা যাবে না। টাইগার পটৌডি সর্বপ্রথম ভারত অধিনায়ক, যিনি একটা নকশা নিয়ে খেলতে নেমেছিলেন। তাঁর হাতে স্পিনার ছিল, তাই স্পিনই ছিল নকশা। কপিল প্রথম বার বিশ্বকাপ জিতেছেন। যা ভারতীয় ক্রিকেটের চেহারাই পাল্টে দিয়েছিল। সৌরভের আমলে বিদেশে নিয়মিত টেস্ট জেতা শুরু হয়। অনেকের কাছে সৌরভ মানে ‘ক্যাপ্টেন জোশ গাঙ্গুলি’। এ সব পরিসংখ্যানে লেখা থাকবে না।
পাশাপাশি, হাতের কাছে থাকা পরিসংখ্যানকেও অস্বীকার করার উপায় কোথায়? যুগ পাল্টাচ্ছে। ক্রিকেট পাল্টাচ্ছে। গত কাল যা ছিল দারুণ কৃতিত্ব, কোহালিদের ব্যাটের দাপটে আজ সেগুলোকেই দেখাতে শুরু করেছে সাধারণ। একটা ঢেউ হারিয়ে যায় পাড়ে এসে, আবার ধেয়ে আসে নতুন ঢেউ! সমুদ্রের মতো ক্রিকেটেও চলে ভাঙাগড়ার খেলা!