নিজের ভুলেই আমি সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারি নি

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর এক দশক পূর্তি হবে আগামীকাল। ২০০৭ সালের ২৫ জুলাই শুরুটা হয়েছিল কলম্বোয় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে দিয়ে। তারপর ১০ বছরে তাঁকে এগোতে হয়েছে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে। গত শনিবার মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে বসে মাহমুদউল্লাহ ১০ বছরের ক্যারিয়ার পর্যালোচনা করলেন যেন ওয়ানডে ক্রিকেটের ছক মেনে!

পাওয়ার প্লে

প্রশ্ন: বর্তমান দলটার কথা যদি বলি, মাশরাফি-সাকিব-তামিম-মুশফিকের পর বাংলাদেশ
দলের আরও একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০ বছর পূর্ণ করতে যাচ্ছেন। অভিজ্ঞতার বিচারে ওয়ানডেতে এখন প্রথম সারিতেই থাকবে বাংলাদেশ। এই দলটার পক্ষে কি ২০১৯ বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব?

মাহমুদউল্লাহ: আমার মনে হয়, ২০১৯ বিশ্বকাপের আগে ২০১৮ সালটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপে কত দূর যেতে পারব, সেটির ভিত্তি তৈরি হবে আগামী বছর। বিশ্বাস করি, আমাদের খুব ভালো সম্ভাবনা আছে। জানি না, শিরোপা জিততে পারব কি না। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, খুব ভালো কিছু অর্জনের সুযোগ আমাদের আছে।

প্রশ্ন: টেস্ট ও ওয়ানডে দুটিতেই অভিষেকে ভালো বোলিং করেছিলেন। সম্ভাবনা ছিল একজন আদর্শ অলরাউন্ডার হওয়ার। সেই সম্ভাবনা কি পুরোপুরি কাজে লাগাতে পেরেছেন?

মাহমুদউল্লাহ: মনে হয় না সম্ভাবনাটা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পেরেছি। দায়টা আমারই। আমি ওভাবে সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারিনি।

প্রশ্ন: প্রথম সাত বছরের তুলনায় গত তিন বছরে আপনি অনেক ধারাবাহিক। এই বদলে যাওয়ার গল্পটা যদি বলতেন…

মাহমুদউল্লাহ: আগের চেয়ে মানসিকভাবে এখন আমি অনেক গোছানো। কিছু সময় গেছে, যখন ভালো করতে পারছিলাম না। হয়তো কোনো একটা সিরিজ খুব খারাপ গেছে। তবে চেষ্টা করেছি সব সময়ই দৃষ্টিভঙ্গিটা ঠিক রাখতে। চেষ্টা করেছি আরও আক্রমণাত্মক ও ইতিবাচক ক্রিকেট খেলতে।

প্রশ্ন: আপনার ফিটনেসেও আমূল বদল এসেছে। কোন সময় থেকে ফিটনেসের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে শুরু করেন?

মাহমুদউল্লাহ: ২০১৪ সালের শেষ দিকে জিম্বাবুয়ে সিরিজ থেকে। ট্রেনার মারিও (ভিল্লাভারায়ন) আমাকে অনেক সহায়তা করেছে। তখন আমার ওজন ছিল প্রায় ৯০ কেজি, এখন সেটি ৭৮। ধাপে ধাপে এগোনোর চেষ্টা করেছি। ফিটনেসে উন্নতিতে আমাকে মারিও অনেক অনুপ্রাণিত করেছে। আপনি যত বেশি ফিট হবেন, ভালো করার সুযোগ তত বাড়বে। ফিটনেস ঠিক না থাকলে দ্রুত ক্লান্ত হওয়া, হাল ছেড়ে দেওয়া—এসব বেশি হবে।

৩০ গজি বৃত্তের বাইরে

প্রশ্ন: ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা বলবেন কোনটিকে?

মাহমুদউল্লাহ: (হাসি) এক-দুইটা নয়, আমার ক্যারিয়ারে অনেক টার্নিং পয়েন্ট! বিভিন্ন পজিশনে ব্যাটিং করতে হয়েছে। যখন শুরু করি, বোলিং অলরাউন্ডার ছিলাম। গড়পড়তা অলরাউন্ডার। এখন ব্যাটিংয়ে আরও বেশি মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করছি। শুরুতে সাতে ব্যাটিং করেছি, পরে চারে উঠেছি—অনেক কিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে। টি-টোয়েন্টিতে আমার ব্যাটিং নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। অনেক ছোট ছোট চ্যালেঞ্জ ছিল। চেষ্টা করেছি এই চ্যালেঞ্জগুলো উতরে যেতে।

প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যে কটি সেঞ্চুরি করেছেন, প্রতিটিই দেশের বাইরে। ওয়ানডেতে যে তিনটি সেঞ্চুরি পেয়েছেন, প্রতিটিই আইসিসির টুর্নামেন্টে। প্রতিকূল কন্ডিশন, বড় মঞ্চ আর চাপে দুর্দান্ত খেলার রহস্য কী?

মাহমুদউল্লাহ: রহস্য নিজেও জানি না (হাসি)। কোনো লক্ষ্য ঠিক করেও খেলি না। সব সময়ই চেষ্টা করি। আল্লাহ হয়তো আমাকে একটু বেশি রহমত করেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি ভাগ্যে ও ধর্মে বিশ্বাসী।

প্রশ্ন: বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম সেঞ্চুরিটা আপনি করবেন, এটা তো অনেকের কল্পনাতেই ছিল না!

মাহমুদউল্লাহ: (হাসি) আমি নিজেও চিন্তা করিনি! তবে ইচ্ছে ছিল। আগে সাত নম্বরে ব্যাটিং করতাম। বিশ্বকাপে সুযোগটা পাওয়ায় (ওপরে ব্যাটিং) বিশ্বাস ছিল, যেহেতু চারে ব্যাটিং করছি লম্বা ইনিংস খেলার সুযোগ আছে। এখানে চন্ডিকা হাথুরুসিংহের (বাংলাদেশ দলের কোচ) ভূমিকা আছে।

প্রশ্ন: টেস্টে আপনার একটিই সেঞ্চুরি, অভিষেকের পর যেটি করতে লেগেছিল মাত্র ৯ ইনিংস। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে হ্যামিল্টন টেস্টে সেঞ্চুরির পর এখনো দ্বিতীয়টির অপেক্ষায়। অপেক্ষাটা কেন ফুরোচ্ছে না?

মাহমুদউল্লাহ: টেস্টে ভালো করতে এখনো কাজ করছি। অনেকগুলো ইনিংসে আউট হয়েছি ৩৫, ৩৭, ৪২, ৪৭ বা ৬২ রান করে। টেস্টে এমন ইনিংসের কোনো গুরুত্ব নেই। কষ্ট করে সেট হচ্ছি, কঠিন ধাপটা পেরিয়ে আউট হয়ে যাচ্ছি। এটা দলের আরও বেশি ক্ষতি করে। এই সমস্যাগুলো আমাকে চিহ্নিত করতে হবে। এ নিয়ে কোচের সঙ্গে কথা হয়েছে।

প্রশ্ন: পছন্দের ব্যাটিং পজিশন না পাওয়াটা কি একটা কারণ? ১০ বছরের ক্যারিয়ারে এখনো নির্দিষ্ট কোনো ব্যাটিং পজিশনে ব্যাটিং করার নিশ্চয়তা আপনার নেই।

মাহমুদউল্লাহ: ও রকম কিছু না। যেকোনো সুযোগই আমার জন্য মূল্যবান। হ্যাঁ, অবশ্যই ওপরে ব্যাটিংয়ের সুযোগ থাকলে ভালো লাগে। এটা বড় দায়িত্বও। যেহেতু দলে অনেক ভালো ব্যাটসম্যান আছে, তাদের না দিয়ে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমারও উচিত সেভাবে খেলা। ভালো না খেললে আমার অধিকার নেই ওই পজিশনে ব্যাটিং করার।

প্রশ্ন: আপনার ক্যারিয়ারে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যেগুলো সিনিয়র খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে কমই ঘটে। সহ-অধিনায়ক হয়েও দল থেকে বাদ পড়েছেন। এ বছর মার্চে শ্রীলঙ্কা সফরে শততম টেস্টে স্কোয়াড থেকেই বাদ পড়লেন। একটু আগে একজনকে বললেন, উত্থানের চেয়ে আপনার পতনই বেশি!

মাহমুদউল্লাহ: পতন তো আমার কারণেই হয়েছে। ভালো খেলতে পারিনি…নিজেকেই দায়ী করব। ভালো না খেললে কথা হবে, সমালোচনা হবে। ভালো করলে সবাই ভালো বলবে। সম্পূর্ণ দোষ আমার। একটা নির্দিষ্ট সময়ে দল যেটা চাচ্ছিল, সেটা দিতে পারিনি। স্বাভাবিকভাবেই অমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। সহ-অধিনায়ক হয়েও বাদ পড়া যেটা বললেন, সেটাও ভালো না খেলায় হয়েছে। আমার অধিকার নেই খারাপ খেলে একটা জায়গা আগলে রাখার।

প্রশ্ন: কিন্তু অনেক সময় আপনাকে বিচার করা হয়েছে দু-একটি ম্যাচের পারফরম্যান্স দেখেই…

মাহমুদউল্লাহ: কাউকে দোষ দিতে পছন্দ করি না। কোনো কিছু ঘটলে মনে করি, এটা আমার কারণে হয়েছে। আমিই দায়ী। চেষ্টা করি, ওখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর, আরও ভালো করার। তবে এটা ঠিক, বিষয়টা সহজ নয়। আমার বড় শক্তি নিজের পরিবার ও সতীর্থরা। এই দুইয়ের সমর্থন খুব গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি যাঁরা ক্রিকেটকে ভালোবাসেন, আপনারা মানে সংবাদমাধ্যমের সমর্থনও খুব জরুরি।

প্রশ্ন: আয়ারল্যান্ড-ইংল্যান্ড সফরের আগে সংবাদমাধ্যম এড়িয়ে চলছিলেন। বলছিলেন, আগে রান করি, তারপর কথা বলব। মনে কি ভীষণ জেদ চেপে বসেছিল?

মাহমুদউল্লাহ: আমি জেদি নই, খুবই সাধারণ মানুষ। তবে একটা তাগিদ ঠিকই থাকে। তাগিদ সব সময়ই থাকে। তবে ওই সময় মাত্রাটা একটু বেশি ছিল। সব সময়ই নিজের মতো করে থাকতে পছন্দ করি। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখি, তা নয়। বরং আগে আরও গুটিয়ে থাকতাম। এখন নিজেকে কিছুটা প্রকাশ করি। আমি মনে করি, এখন আপনাদের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অনেক বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: দীর্ঘদিন জাতীয় দলে খেলছেন। মাশরাফি-সাকিব-তামিম-মুশফিক যতটা তারকাদ্যুতি পেয়েছেন, আপনি ততটা নন। যতটুকু তারকাখ্যাতি পেয়েছেন সেটিও ২০১৫ বিশ্বকাপের পর। এ নিয়ে আক্ষেপ আছে?

মাহমুদউল্লাহ: মাশরাফি-সাকিব-তামিম-মুশফিক শুরু থেকেই আমার চেয়ে ভালো পারফরমার। যেটা বললেন তারকাদ্যুতি, তাদের এটা বেশি এ কারণেই। আগেই বললাম, আমি খুব সাধারণ। খুব চাকচিক্য নয়, সাধারণ জীবনযাপনের চেষ্টা করি। তারকা তকমাটা না লাগার এটাও একটা কারণ। তারকাখ্যাতির জন্য আমি ছুটি না।

প্রশ্ন: ঘরোয়া ক্রিকেটে অধিনায়কত্ব করেন নিয়মিত। জাতীয় দলের হয়ে অধিনায়কত্ব করার স্বপ্ন নিশ্চয়ই দেখেন?

মাহমুদউল্লাহ: এখন সাধারণ খেলোয়াড় আছি, সেটাই থাকি। দলের সদস্য হিসেবে যে দায়িত্ব পালন করছি, সেটি আরও কীভাবে ভালোভাবে করা যায়, সেটা নিয়ে ভাবছি। অধিনায়কত্ব ভবিষ্যতের বিষয়। সেটি ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাক।