মুশফিক এত্ত ছোট মানুষটা , এত্ত ছক্কা মারেন কিভাবে?

ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম যখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের কেবিনে ঢোকেন, তখন বেডে লাল চাদর গায়ে মুক্তামনি চোখ বুজেছিল। গত বুধবার থেকেই শরীরটা ভালো ছিল না। প্রচণ্ড জ্বর আর রক্তশূন্যতা নিয়ে চিকিৎসকদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। তবে বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেট দলের অধিনায়ক যখন ঘুমন্ত মুক্তামনির কপালে হাত রাখলেন, তখন চোখ খুলই চমকে ওঠে মুক্তামনি।

শনিবার বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মুশফিকের সঙ্গে মুক্তামনির। তবে তখনও সে এক বিস্ময় ঢেকে রেখেছিল, বোঝা গেল এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে। মুক্তামনি বললো, ‘মুশফিকের খেলা তো টিভিতে দেখেছি। আজ তিনি আমাকে দেখতে এসেছেন, আমার মাথায় হাত রেখে দোয়া করেছে। বলছেন, সবার কাছে তিনি আমার জন্য দোয়া চাইবেন। কিন্তু তাকে দেখার পর থেকে কেবলই মনে হচ্ছে, এত্ত ছোট মানুষটা এত্ত এত্ত ছক্কা মারেন কিভাবে?’

তুমি ক্রিকেট খেলা দেখো?—এমন প্রশ্নের জবাবে মুক্তামনি বলেন, ‘আমি মুশফিক, মাশরাফি, সাকিবসহ সবাইকে চিনি। ক্রিকেট খেলা দেখি।’ বলতে বলতেই তার গলার স্বর বদলে যায়। বলে, ‘আসলে আমার তো কিছু করার থাকে না, তাই বাড়িতে বসে বসে কেবল টিভি দেখি। আমাদের বাড়িতে টিভি ছিল না। কিন্তু কেবল আমি দেখব বলে আব্বু টিভি কিনে এনেছেন।’

প্রসঙ্গত, শনিবার (২২ জুলাই) ঢামেকের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি মুক্তামনিকে দেখতে যান বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। তবে কেবল দেখতে যাওয়াই নয়, ছোট্ট মুক্তামনির অসুখের কথা শুনে এর আগে তার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন তিনি, করেছেন আর্থিক সহায়তাও।

মুক্তামনিকে মুশফিক বলেন, ‘তুমি চিন্তা করবে না। পুরো দেশ তোমার সঙ্গে আছে। তুমি সুস্থ হয়ে যাবে। আমার সঙ্গে যার দেখা হয়, তাকেই তোমার কথা বলি, তোমার জন্য দোয়া চাই।’ জবাবে মুক্তামনি বলে, ‘আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন।’

তবে মুক্তামনির কেবিনে যাওআর আগে মুশফিক যান বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেনের কক্ষে। সেখানে ডা. সামন্ত লাল সেন তাকে বলেন, ‘পুড়ে যাওয়া রোগীদের সচেতনায় ক্রিকেট তারকাদের পাশে চাই।’ জবাবে মুশফিক বলেন, ‘আমি নিজেও যেকোনও ধরনের সামাজিক কাজে অংশ নিতে আগ্রহী।’ যেকোনও ধরনের সচেতনতায় বার্ন ইউনিট পাশে পাবে বলেও তিনি জানান।

কাজের প্রয়োজনেই এ প্রতিবেদক মুশফিক ও মুক্তা মনির যে ছবি তুলেছেন, সেটি তার চোখ এড়ায়নি। তাকে দেখে আসার প্রায় দেড়ঘণ্টা পর এ প্রতিবেদককে ফোন করে মুক্তামনি বলে, ‘আন্টি, মুশফিকের সঙ্গে আমার যে ছবিগুলো তুলেছে, সেগুলো আমাকে দেবেন। আব্বুর ফোনে দিলেই আমি সেগুলো দেখতে পারব। আব্বুকে বলব, সেগুলো বাঁধাই করে আমাদের বাড়িতে রেখে দিতে।’

মুশফিকের ছবি বাঁধানোর কারণ জানতে চাইলে মুক্তামনি বলে, ‘ডাক্তাররা বলেছেন, আমি সুস্থ হয়ে যাব। তখন তো আবার স্কুলে যাব। ছবিগুলো তখন আমাদের বন্ধুদের দেখাতে পারব।’

মুক্তামনির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম

তবে এর আগে মুক্তামনিকে নিয়ে খুব দুঃশ্চিন্তায় ছিলেন জানিয়ে ডা. সামন্ত লাল সেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত বুধবার ওর (মুক্তামনি) শরীরটা বেশ খারাপ হয়েছিল। আমরা প্রচণ্ড চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। জ্বর ও একইসঙ্গে রক্তশূন্যতা হলে তো মেয়েটাকে সুস্থ করে তোলার জন্য অপারেশন করার উপযোগী করতে দেরি হয়ে যাবে।’ তবে গতকাল থেকেই জ্বর নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মেয়েটার মানসিক শক্তি খুব বেশি। এতটুকুন মেয়ে, সে কিছুতেই ভেঙে পড়ে না।’

শারীরিক অবস্থা এমন থাকলে আগামী সপ্তাহ নাগাদ তার বায়োপসী হবে বলেও জানান ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি বলেন, ‘মুক্তামনির চিকিৎসায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে, মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্যও বাড়ানো হয়েছে। যেন কোথাও কোনও ঘাটতি না থাকে।’

মুক্তামনির শারীরিক অবস্থার উন্নতির কথা জানালেন মুক্তামনির মা আসমা খাতুনও। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘গতকাল এক ব্যাগ, পরশু তিন ব্যাগ রক্ত দেওয়ায় চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, রক্তশূন্যতা কিছুটা কমেছে। এখন ওর পুষ্টি দরকার। আরেকটু সুস্থ হলেই ওর চিকিৎসা শুরু হবে।’

উল্লেখ্য, গত ১২ জুলাই ঢামেক হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তির পর প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকরা চারটি রোগের কথা ধারণা করলেও অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা গেছে লিমফেটিক ম্যালফরমেশন রোগে ভুগছে মুক্তামনি। এটি একটি জন্মগত রোগ (কনজিনেটাল ডিজিস)। এর বিশেষত্ব হচ্ছে জন্মের পরপরই কিছু ক্ষেত্রে এর প্রকাশ পায় কারও কারও ক্ষেত্রে। আবার কারও ক্ষেত্রে পায় না।তবে মুক্তামনি এতদিন অবহেলা আর অপচিকিৎসার শিকার হয়েছে বলে পরিবার ও চিকিৎসকদের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে। অবশ্য দেরিতে হলেও চিকিৎসকরা এখন বলছেন, তারা আশাবাদী। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার পর তার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যেই সাতক্ষীরার এই মেয়েটির চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।-বাংলা ট্রিবিউন